বাল্যকাল কেটেছে স্বপ্ন আর খেলায়,
ভাবতাম, "কবে হবো বড়ো?"—মন দিতো হেলায়।
ভাবতাম, "কবে পাবো আমি স্বাধীনতা?"
জীবন যে কী, ছিল না ধারণা।
যৌবন কেটেছে অর্থ আর যশে,
জ্ঞান অর্জনের দৌড়ে ছুটেছি বেশে।
স্বপ্নের পেছনে ছুটতে ছুটতে,
ভাবতাম, "বাল্যকালই ভালো ছিল আসলে!"
বার্ধক্য এলো ক্লান্তি আর ব্যথায়,
সংসারের চিন্তায় মন ঘুরপাক খায়।
শান্তির আশায় ঈশ্বরের দ্বারে,
ভাবি, "এই জীবন গেলো কিসে, বলো তারে?"
শিক্ষা বিক্রি হয় অর্থের দামে,
যৌবন বিকোয় স্বার্থের নামে।
বার্ধক্য নুয়ে যায় দুশ্চিন্তায়,
শান্তি কোথায়? কেউ কি জানায়?
হৃদয়ের গভীরে আজও আলো জ্বলে না,
শান্তি খুঁজে ফিরি, পাই না কোথাও তা।
সমাধী
নিভৃতে বসে যোগী একাকী,
চোখে নেই দৃষ্টি, শরীরে নেই গতি,
তুষারের চূড়ায় স্তব্ধ এক শিখর,
অস্তিত্ব লীন অপার জ্যোতি।
নেই আর সৃষ্টি, নেই আর লয়,
নেই আলো, নেই অন্ধকার,
নেই সূর্য, নেই তারার দীপ্তি,
শুধুই শূন্য এক নিরাকার।
প্রলয়ের আগুন নিভে গেছে যেথা,
ভয়ে স্তব্ধ মহাকাল রথ,
নেই গতির রেখা, নেই সময়ের ধারা,
শব্দও নেই, নেই কোনো পথ।
কোটি সূর্য, চন্দ্রের আলো,
বিলীন হয়েছে এক মহাশূন্যতায়,
আলো নেই, আঁধারও নেই,
শুধু অপার নিরাকার ব্রহ্মস্বরূপ।
দিন নেই, রাত নেই, নেই দিগন্ত,
নেই চেতনার ঢেউ, নেই সঙ্গীত,
শব্দ যেখানে স্তব্ধ হয়ে যায়,
শুধু বিরাজে অনন্ত শুদ্ধ গীত।
"আমি" যে ছিল, তারও অন্ত হলো,
নেই নাম, নেই রূপ, নেই কোনো অনুভূতি,
বাক্যের অতীত, চিন্তারও ঊর্ধ্বে,
শুধুই বিরাজে এক নিরব অনন্ত গতি।
কিন্তু যেখানে থেমে যায় সব,
যেখানে নেই গতি, নেই স্পন্দন,
নেই শব্দ, নেই কোনো দ্বন্দ্ব,
সেখানে আছে—সচ্চিদানন্দ স্বরূপ,
নিত্য সত্য, পূর্ণ জ্ঞান!
কোথায় ঈশ্বর?
মানব সমাজ খুঁজে ফেরে ঈশ্বর,
কেউ যায় তীর্থে, কেউ মন্দিরের দ্বার।
গঙ্গায় ধুয়ে পাপের গ্লানি,
তবু ঈশ্বর, তোমায় পাইনি!
হে প্রভু, কোথায় তুমি?
তীর্থে ঘুরে, দরজায় দরজায়,
তবু কেন দেখা মিলল না?
উত্তরে এলো এক সন্ন্যাসী বীর,
বলে গেলেন বাণী গম্ভীর—
"জীবে প্রেম করে যেই জন,
সেই জন সেবিছে ঈশ্বর" !
এই সংসার শিবময় এক,
সকল জীবেই ঈশ্বর লুকায়া থাক!
তবু আমরা বানাই সোনার মন্দির,
আর ক্ষুধার্ত থাকে অন্নবিহীন, নিরবধির।
বিলাসিতা বাড়ে, হৃদয় শুকায়,
দরিদ্রের কান্না পথেই শুকায়।
এসো, সেবায় উৎসর্গ করি জীবন,
মানবপ্রেমেই ঈশ্বরের দান!
সত্য বলে প্রকৃতির বাণী,
জীবসেবাতেই শিবের জানি!
সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র
জনকিনাথের সিংহ সন্তান,
বঙ্গের অগ্নি, অমিত প্রাণ।
বাল্যকালে স্বপনে জাগে,
সব ছেড়ে দিই—সন্ন্যাসি হয়ে লাগি!
মুক্তি চাই শুধু আপন প্রাণে,
সংসার বাঁধন কাটুক গানে।
কিন্তু বিধি দিল অন্য ডাকে,
দেশের সেবা—ধ্বনি উঠল অন্তরে।
সন্ন্যাস নয়, দেশই ধর্ম,
পরাধীনতার ভাঙতে চর্ম।
তাই তো ত্যাগলে সুখের বাস,
ছাড়লে আই.সি.এসের সুবর্ণ আশ।
গড়লে তবু নব ইতিহাস,
আজাদ হিন্দের জ্বলালে আশ।
স্বাধীন ভোরের আনলে বারতা,
সকল জাতির মুক্তি প্রার্থনা।
তবু কী আশ্চর্য, কী অপার রহস্য,
অজানা রইল তোমার অন্তর্ধান!
প্রভাতের রোদের মতো এসেছিলে,
অন্ধকার রাতের মতো হারিয়ে গেলে!
তাই তো তুমি মরণজয়ী,
তুমি হারাওনি, তুমি মিশেছো,
ধূলি হয়ে, আগুন হয়ে, বজ্র হয়ে,
তুমি চির-অমর, চিরো জাগ্রত সুভাষ!
আমি কে?
আমি কে? আমি কি শুধু এক নাম?
নাম ছাড়া আমার কি কোনোই দাম?
নাম যদি মুছে যায় কালের স্রোতে,
তবে কে রবে আমার স্মৃতির মোতে?
কোথা হতে এলাম, কোথা যাবো,
কেন এই পথে, কেনই বা ভাসবো?
নিয়তির টানে যাই ভেসে ভেসে,
কোথায় যে শেষ, তার খোঁজ কে যে দেবে?
আমি কি আলো, নাকি ছায়ার ছদ্ম?
সময় কি শুধুই দেয় ধোঁকার মঞ্চ?
জন্ম-মৃত্যুর মাঝের এ পথ,
আসলেই কি সত্য, নাকি শুধুই এক স্বপ্ন?
আকাশের তারা কি জানে সে কথা?
বাতাসের সুরে কি লুকানো ব্যথা?
পাহাড়ের নীরবতা, নদীর কলতান,
কি বলে আমায় এই জীবন-গান?
আমি আজও খুঁজি, পাই না উত্তর,
প্রশ্নগুলো শুধু হয় গভীরতর।
তবুও চলি, এ পথ তো শেষ নয়,
হয়তো একদিন সব প্রশ্ন মিটিয়ে,
সত্যের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে—
আমি চিনে নেবো আমায়, আমি কে!
শিব
হিমালয়ের শ্বেত শিখরে,
ধ্যানে মগ্ন এক মহাযোগী।
শ্মশান ভস্ম বিভূষণ যার,
চরণে নত ত্রিলোক তার।
ডমরু বাজে রুদ্র তালে,
প্রলয় নাচে বিশ্ব জ্বালে।
ত্রিশূল হাতে কালো ক্রোধে,
ধ্বংসের মাঝে সৃষ্টি জাগে।
নীল কণ্ঠে বিষের ধারা,
স্নিগ্ধ গঙ্গা জটায় ভরা।
ত্রিনয়নে অগ্নি জ্বলে,
সংসার জুড়ে শান্তি বলে।
বাঘছালে যে মহাযোগী,
মায়াহীন, প্রেমেই যোগী।
সৃষ্টির আদ্য, বিনাশের দেব,
শম্ভু, শিব, মহাদেব!
সিদ্ধার্থ থেকে বুদ্ধ
শাক্য রাজা পেলেন ভয়,
যদি রাজপুত্র হয় সন্ন্যাসী,
রাজ্য ছেড়ে নির্জন পথে,
বেছে নেয় অজানার বাসি।
বিলাস, ঐশ্বর্য, নৃত্য-গান,
সব সাজালেন তার জীবনে,
তবু কি মায়া বাঁধতে পারে?
সত্যের ডাক যে রয় অন্তরে।
একদিন চললেন রথে,
দেখলেন চারটি দৃশ্য ভীষণ,
বৃদ্ধ, রোগী, মৃতের শয্যা,
আর সন্ন্যাসীর শান্ত মন।
বুঝলেন এ সংসার মায়া,
দুঃখেতে ভরা এ জীবন,
ত্যাগ করিলেন রাজপ্রাসাদ,
সত্যের খোঁজে নির্জন বন।
বছর কেটে গেল তপস্যাতে,
শেষে একদিন বোধি তলে,
জাগ্রত হলো জ্ঞানের আলো,
সিদ্ধার্থ বুদ্ধ রূপে জ্বললে।
বললেন, "লোভ-মোহের বন্ধন ভাঙো,
সত্যের পথে এসো সবাই,
বিবেক, করুণা, দয়া ধরে,
জীবন গড়ো শান্তির ঠাঁই।"
প্রথম ভালোবাসা
ভালোবাসা মানে কি শুধু দু’জনার কথা?
হাতে হাত রাখা, নীরব রাতের ব্যথা?
নাকি ভালোবাসা এক পবিত্র শপথ,
যেখানে দেশ আগে, বাকিটা পথ?
যে তরুণ আজ দাঁড়িয়ে সীমান্তপ্রহরে,
তার হৃদয় জ্বলছে লাল সূর্যকিরণে।
সে ভালোবাসে, কিন্তু একা নয়,
তার প্রেমিকা দেশ, ত্যাগ যার পরিচয়।
একদিন যারা শিকল ভেঙেছিলো,
স্বাধীনতার রঙ রক্তে এঁকেছিলো,
তাদের প্রেমিকা ছিলো এই মাটি,
তাই তো জীবন দিলো হাসিমুখে খাঁটি।
আজও কিছু হৃদয় মত্ত উৎসবে,
গোলাপে, মোমবাতির আলোয় হাসে।
কিন্তু কিছু প্রেমিক প্রাণ উৎসর্গ করে,
দেশের নামে ত্যাগের শপথ রাখে।
তাদের ভালোবাসা লাল সূর্য সমান,
শত্রুর বুলেটেও হয় না ম্লান।
তাই আজও তারা ইতিহাসে অমর,
দেশপ্রেমিক প্রেম হয় না মিছে কখনও পর।
বুদ্ধের জাগরণ
রাজ্য, বৈভব, বিলাস মিছে,
সত্যের টানে মন যে কাঁদে।
চারটি দৃশ্য চোখে জল আনে,
জন্ম-মৃত্যু দুঃখের বাঁধে।
তবু জাগে আশার আলো,
সন্ন্যাসীর শান্ত চরণতলে।
চুপিচুপি নিশীথ রাতে,
চলে গেলেন বনের তলে।
তপস্যাতে দীপ জ্বালালেন,
বোধি বৃক্ষে বসলেন ধীরে।
সত্যের আলো ছড়াল জগতে,
বুদ্ধ জাগেন প্রভাত ভোরে।
উপদেশ দিলেন শান্তস্বরে,
প্রেমেই গড়ে পথ সৎকরে।
লোভ-মোহ ভুলে করুণা ধরো,
তবেই প্রাণে শান্তি ভরো।
বললেন তিনি মৃদু বাণী —
"ত্যাগ করো হিংসা ও অভিমানই,
প্রেম আর করুণার পথে হাঁটো,
সেই সুখই চিরকাল থাকো।"
বিবেকের খোলা তলোয়ার
উঠেছে যে তলোয়ার— বজ্রের তেজে,
গৈরিক বস্ত্রে অগ্নি জ্বলে সন্ন্যাসীর বেশে।
পদ্ম–পলাশ লোচনে জাগে সিংহের দাবানল,
কে বলে এ সন্ন্যাস? এ যে ধর্মযুদ্ধের মহাবল!
এক বজ্রনাদে কেঁপে উঠল বিশ্ব-সংসার,
শিকাগোর সভামঞ্চে জ্বলে উঠল ন্যায়ের জ্বার।
শিরায় নেই ভয়, মনে নেই কোনো ভ্রম—
যে ধর্মে মানুষ মরে, সে ধর্মের হোক ক্ষয়!
দরিদ্র তাঁর দেবতা, ক্ষুধার্তই নারায়ণ,
সেবার মাঝেই দেখেছেন তিনি মুক্তির কারণ।
হাজার চোখের অশ্রু তাঁর বুকে আগুন জ্বালে,
সে আগুনেই গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ কালে।
তিনি নারায়ণ, তিনি মহাবীর, রামের প্রাণ,
লোভ-লালসার লবণসিন্ধু লঙ্ঘন তাঁর মান।
বিবেক তাঁর তরবারি, আনন্দ তাঁর আলো—
তিনিই আমাদের সন্ন্যাসী-সৈনিক, স্বামী বিবেকানন্দ।
শিবময় এ সংসার
একটি ছোট গ্রামে অরিন্দম নামে এক যুবক বাস করত। ছোটবেলা থেকেই সে শুনে এসেছে—শিব থাকেন কৈলাস পর্বতের চূড়ায়, কাশীর মন্দিরে, কিংবা শ্মশানের নিঃশব্দ ভস্মময় প্রান্তরে। এই কথাগুলো তার মনে এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলেছিল—সে শিবকে দেখবে, তাঁর দর্শন লাভ করবে।
অবশেষে একদিন সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। প্রথমে গেল কাশী। আরতির আলো, শঙ্খধ্বনি, ভক্তদের ঢল—সবই তাকে অভিভূত করল। তবু তার মনে প্রশ্ন জাগল—“শিব কি শুধু এই মন্দিরেই সীমাবদ্ধ?”
তারপর সে হিমালয়ের পথে যাত্রা করল। বরফঢাকা শৃঙ্গের নীরবতায় বসে ধ্যান করল দিনের পর দিন। কিন্তু অন্তরের যে শূন্যতা, তা পূর্ণ হল না।
হতাশ মনে ফিরছিল সে। তখনই পথের ধারে দেখল—এক বৃদ্ধ ভিক্ষুক ক্ষুধায় কাঁপছে। একটু দূরে এক শিশু কান্নায় ভেঙে পড়েছে। চারপাশে কেউ নেই।
অরিন্দমের মনে দ্বন্দ্ব শুরু হল—সে কি নিজের সাধনায় অটল থাকবে, নাকি এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াবে?
ঠিক তখনই তার মনে প্রতিধ্বনিত হল সেই বাণী—
“বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর?
জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।”
অরিন্দম আর দেরি করল না। নিজের অন্ন বৃদ্ধকে দিল, শিশুটিকে কোলে তুলে সান্ত্বনা দিল।
সেই মুহূর্তে তার হৃদয়ে এক গভীর শান্তি নেমে এল—যেন অদৃশ্য করুণাময় কোনো শক্তি তাকে আশীর্বাদ করল।
সেই রাতে স্বপ্নে সে দেখল—এক জটাধারী, ত্রিশূলধারী, করুণাময় মহাপুরুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখে অসীম স্নেহ। তিনি মৃদু হেসে বললেন—
“কৈলাস খুঁজতে দূরে যেয়ো না। মনকে শিবময় করো, তাহলেই তোমার হৃদয়ই কৈলাস হবে।”
ঘুম ভেঙে অরিন্দম বুঝল—শিবকে বাইরে নয়, ভেতরে খুঁজতে হয়।
যেই শিব, সেই জীব। যেই জীব, সেই শিব।
তখন তার হৃদয়ে যেন ভেসে উঠল এক অজানা সুর—
“শিবময় এ সংসার ওরে জীব কি জান না,
প্রকৃতি প্রভাবে শিবে করিছ জীব কল্পনা…”
সেদিন থেকে সে আর তীর্থের সন্ধানে ঘোরেনি। মানুষের সেবাকেই সে নিজের পূজা করে নিল।
তার চোখে এখন প্রতিটি মুখেই শিবের রূপ।